শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৫ অপরাহ্ন

ক্ষমতার মঞ্চে রাজনীতির খেলায় পিষ্ট সাধারণ মানুষ

হাবিবুর রহমান (বাপ্পী)
  • প্রকাশ সময় : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

ক্ষমতার রাজনীতি—এটি কি সত্যিই আদর্শের লড়াই, নাকি কেবল প্রভাব আর প্রভুত্বের নির্মম খেলা? এই প্রশ্ন আজ আর তাত্ত্বিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে যখন ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ চলে, তখন সেই হিসাবের বাইরে পড়ে যায় সেই মানুষগুলো, যাদের জন্য এই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব।

দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের গভীর অসামঞ্জস্য, আর অনিশ্চিত জীবিকার চাপে মানুষ আজ এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি। যে পরিবার মাসের শুরুতে একটি স্বাভাবিক বাজেট করত, আজ তারা মাসের মাঝপথেই হিমশিম খাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলো যেন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বেঁচে থাকাটাই যেন এখন এক ধরনের সংগ্রাম।

শিক্ষা, যা ছিল উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি, সেটিও আজ এক বিলাসপণ্য। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সন্তানকে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ানো এখন প্রায় অসম্ভব। সরকারি ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা, বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়—এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে পড়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। একই চিত্র চিকিৎসা খাতে। অসুস্থতা মানেই এখন আতঙ্ক, কারণ চিকিৎসা ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বাসস্থান, যা একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, সেটিও এখন আকাশ-কুসুম কল্পনা। শহরের বাড়িভাড়া হোক বা গ্রামে জমির মূল্য—সবকিছুই এমনভাবে বেড়েছে যে সাধারণ মানুষের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই যেন আজ এক অন্তহীন দৌড়ের নাম।

কিন্তু জীবনের এই সংগ্রাম শুধু বেঁচে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—মৃত্যুর পরেও সাধারণ মানুষ মুক্তি পায় না এই ব্যয়বহুল শহুরে বাস্তবতা থেকে। এই শহরে কোনো সাধারণ মানুষ মারা গেলেও তার মরদেহ নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া এক দুঃসহ লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। অ্যাম্বুলেন্স কিংবা পিকআপ ভাড়া জোগাড় করতে পরিবারকে হাত পাততে হয় আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মীদের কাছে। মৃত্যুর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থের অপমানজনক সংগ্রাম—একটি মরদেহ পর্যন্ত যেন সম্মানের সঙ্গে পৌঁছাতে পারে না তার শেষ ঠিকানায় ।অন্যদিকে, যদি নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত কোনো পরিবার শহরেই দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানেও অপেক্ষা করে আরেক নির্মম বাস্তবতা। কবরস্থানের এক টুকরো জায়গার জন্য গুনতে হয় হাজার হাজার, কখনো লক্ষ টাকারও বেশি। মৃত্যুর পরও শান্তির নিশ্চয়তা নেই—কবরের মাটিও যেন এখন অর্থের বিনিময়ে কেনা একটি পণ্য।

আশ্চর্যের এই নির্মম যাদুর শহর—
এখানে বেঁচে থাকতে টাকা লাগে, মরতেও টাকা লাগে, এমনকি শেষ আশ্রয়ের জন্যও দিতে হয় মূল্য। এই বাস্তবতার ভেতরেই প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়? রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হয়ে ওঠে, তাহলে সেই রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল যে জনগণ, তারা কেন আজ প্রান্তিক?

আদর্শের কথা বলা হয়, উন্নয়নের গল্প শোনানো হয়, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল কি পৌঁছাচ্ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে? নাকি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে সব অর্জন? ক্ষমতার পালাবদল হয়, মুখ বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন কেন ঘটে না? কেন প্রতিবারই নতুন আশার সূচনা হয়, আর কিছুদিনের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে হতাশার দেয়ালে?

এই প্রশ্নগুলো আজ কেবল সাংবাদিকের নয়, প্রতিটি নাগরিকের। রাষ্ট্র কি কেবল ক্ষমতাধরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি সেই মানুষের দিকেও তাকাবে, যারা প্রতিদিন সংগ্রাম করে এই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখছে?রাষ্ট্রের কাছে আজ জবাবদিহির সময়। জনগণ তাকিয়ে আছে—কাদের দিকে তাকাবে রাষ্ট্র? ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে, নাকি সেই মানুষের দিকে, যাদের নীরব কষ্টেই দাঁড়িয়ে আছে পুরো ব্যবস্থাটি?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—এই রাষ্ট্র কার?
ক্ষমতার রাজনীতির, নাকি সাধারণ মানুষের?

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ নাহিন খান
raytahost-tmnews71