
আবু আফরান মোঃ নোমান: একসময়ের দিনমজুর রিকশাচালক, আজ কোটি টাকার মালিক! নাম বশির আহমেদ, ওরফে ‘রিক্সা বশির’। গত দেড় দশকে রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে তার উত্থান। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপট, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং অবৈধ অটোরিকশার সিন্ডিকেট বানিয়ে শূন্য থেকে কোটিপতি বনে গেছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শ্রমিক লীগের পদ ব্যবহার করে আখের গোছালেও, পটপরিবর্তনের পর গিরগিটির মতো রূপ বদলে এখন রাতারাতি ঢুকে পড়েছেন বিএনপিতে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাহাঙ্গীরের অতি ঘনিষ্ঠজন হিসেবে বাড্ডা এলাকায় পরিচিতি পান বশির। বাগিয়ে নেন বাড্ডা থানা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতির পদ। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সাইনবোর্ড ব্যবহার করে মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট, পোস্ট অফিস রোড, আফতাবনগর এবং পুলিশ প্লাজা এলাকায় একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেন তিনি। এসব এলাকায় অবৈধ অটোরিকশা নামিয়ে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, রিকশার চাঁদার টাকার একটা বড় অংশ স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশ, থানা ও প্রভাবশালী চক্রের পকেটে ঢুকিয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতেন বশির। শুধু রিকশাই নয়, নিজ ক্ষমতার দাপটে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ ব্যবহার করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে ২০০টিরও বেশি অবৈধ অটোরিকশা এবং ৩০০টির বেশি ম্যানুয়েল রিকশা রয়েছে বশিরের নিজেরই। এছাড়া পুরো ওয়ার্ডের হাজার হাজার অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণও তার হাতে। রিকশা ব্যবসার আড়ালে গড়ে তুলেছেন এক অপরাধ জগৎ। বশিরের আপন শ্যালক আলাচন ও আক্তারের নেতৃত্বে এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে, আর এসবের নেপথ্য আশ্রয়দাতা বশির নিজে। মাদক কেনাবেচা এবং সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয় বশিরের রিকশার গ্যারেজগুলো। অভিযোগ রয়েছে, অজ্ঞান পার্টি ও নামকরা রিকশা চোর চক্রের নিয়মিত যাতায়াত এবং আশ্রয়স্থল বশিরের এই গ্যারেজ।
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন কাউন্সিলর জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে সরাসরি আন্দোলনে হামলা ও গণপ্রতিরোধ দমনে অংশ নেন বশির। সরকারের হয়ে এলাকায় মাইকিং করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন বশির ও তার অনুসারী ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সভাপতি রাসেল গং। ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় বাড্ডা থানায় দুর্জয় আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে বশির এজাহারভুক্ত আসামি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গা ঢাকা দেওয়ার কথা থাকলেও অলৌকিকভাবে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন রিকশা বশির। অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গিরগিটির মতো দল বদলে তিনি এখন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলে ভিড়েছেন। মামলা ধামাচাপা দিতে এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে নিজের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দলবদলের বিষয়ে জানতে চাইলে বাড্ডা থানা রিকশা শ্রমিক লীগের সভাপতি মকবুল আহমেদ বলেন, “বশির আগে আমাদের সংগঠনের (শ্রমিক লীগ) সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল এবং সহ-সভাপতি ছিল। তবে পটপরিবর্তনের পর সে এখন বিএনপি করছে।”
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে যেখানে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি উঠছে, সেখানে ‘রিক্সা বশির’-এর মতো সুবিধাভোগী ও মামলার আসামিরা কীভাবে দল বদলে বহাল তবিয়তে তাদের সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের খুঁটির জোর কোথায়—প্রশাসনের কাছে এখন সেটাই সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা।